
দীর্ঘ সতেরো বছর লন্ডনে থাকলেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দৃঢ় নেতৃত্বে দলকে টিকিয়ে রেখেছেন নিপীড়ন–নিষ্পেষণের কঠিন সময়েও। গত বছরের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে তাঁর নির্দেশনায় ছাত্র-জনতা একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ৫ আগস্টের মধ্যেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা শাসনের অবসান ঘটে। সেই থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা। শুরু থেকেই নভেম্বর–ডিসেম্বরে তাঁর ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা থাকলেও সঠিক সময় নিয়ে নিশ্চিত তথ্য ছিল না। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের মাঝে থেকে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার ইচ্ছার কথা নিজেই জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে ২৩ নভেম্বর রাতে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজধানীর এভার কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় তাঁর ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে এবং অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে দেশজুড়ে। মা খালেদা জিয়ার এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতির কারণেই অনেকেই মনে করছেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা সামনে এগিয়ে আসতে পারে। গতকাল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই তারেক রহমান দেশে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন এবং পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে খুব শিগগিরই তিনি দেশে ফিরবেন।
চীনা চিকিৎসক দল ইতোমধ্যেই ঢাকায় এসে চিকিৎসায় যুক্ত হয়েছে, পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের মেডিক্যাল টিমও এসে স্থানীয় চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করছে। তাঁরা যদি মনে করেন বিদেশে নেওয়া জরুরি, তবেই খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হতে পারে; সেক্ষেত্রে তারেক রহমানের দেশে ফেরা কিছুটা দেরি হতে পারে। আর যদি দেশের ভেতরেই চিকিৎসা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়, তবে তিনি অতি দ্রুত দেশে ফিরতে পারেন।
এরই মধ্যে দলীয় স্থায়ী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি সভাপতিত্ব করেন তারেক রহমান। সেখান থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সভা শেষে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন—“খুব শিগগিরই দেশে ফিরছেন তারেক রহমান।” পরিস্থিতিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে খালেদা জিয়াকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করে তাঁর জন্য এসএসএফ নিরাপত্তা সুবিধা দেওয়া। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশে ফিরলে তারেক রহমানও একই ধরনের নিরাপত্তা সুবিধা পেতে পারেন, যা তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে বহুদিনের উদ্বেগ অনেকটাই কাটিয়ে দেবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়ে দিয়েছেন—বাংলাদেশে কারো নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই এবং যাদের বিশেষ নিরাপত্তা প্রয়োজন, তাদের জন্য সরকার সর্বদা প্রস্তুত। ইতোমধ্যেই রাজধানীর গুলশানের এভিনিউ রোডে তারেক রহমানের থাকার জন্য একটি বাড়ি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং জাপান থেকে বুলেটপ্রুফ গাড়ি আনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত তারেক রহমান ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করেননি বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। তিনি পরিষ্কার করেছেন, আবেদন করলেই একদিনের মধ্যেই ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে, কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাঁর ফেরার বিষয়ে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
অন্যদিকে হাসপাতালের সিসিইউতে চিকিৎসাধীন মা খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন তারেক রহমান। মেডিক্যাল বোর্ডে থাকা চিকিৎসকদের মধ্যে তাঁর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানও রয়েছেন, যা চিকিৎসা ব্যবস্থায় পরিবারকে আরও সম্পৃক্ত রেখেছে।
বিএনপির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, তফসিল ঘোষণার আগে-পরে তারেক রহমান দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু খালেদা জিয়ার হঠাৎ অবনতিশীল অবস্থা তাঁর ফেরার তারিখ আরও এগিয়ে আনতে পারে। দলীয় নেতারা বলছেন, তাঁর ফেরার ঘোষণা এলেই দেশজুড়ে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি হবে। কারণ দেড় দশকের কঠিন ফ্যাসিবাদী শাসনের সময়ে যেভাবে তিনি দলকে সুসংগঠিত রেখেছেন, বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন—তাতে তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে শক্ত জায়গা করে নিয়েছেন। তাই তাঁর হঠাৎ দেশে ফেরা লাখো মানুষের কাছে হবে এক স্মরণীয় মুহূর্ত, যা দেশজুড়ে উচ্ছ্বাসের ঢেউ তুলবে।
তারেক রহমানের ফেরার প্রস্তুতি এতটাই সুসংগঠিত যে, তিনি ফিরলেই স্বাগত জানাতে প্রস্তুত রয়েছে দেশব্যাপী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপির জন্য তাঁর উপস্থিতি এখন সময়ের দাবি। আর তাঁকে কেন্দ্র করেই উঁকি দিচ্ছে রাজনীতির নতুন সমীকরণ—একদিকে গুরুতর অসুস্থ মা, অন্যদিকে অপেক্ষার প্রহর গোনায় থাকা পুরো জাতি।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আরিফ খান
Developed by Shakil IT Park