
লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ১৩ বছরের সামিয়ার মৃত্যুর এক বছর পার হলেও এখনও উদঘাটিত হয়নি মৃত্যুর সঠিক রহস্য। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা রয়েছে অধরা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে ওই শিশু শিক্ষার্থী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমন প্রতিবেদন প্রকাশের পরও কোনো কিছুই করতে পারছে না পুলিশ! এটিকে পুলিশের ব্যর্থতা, নাকি অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা। এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।
সামিয়ার পরিবার এখনও তার স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। তার জামা-কাপড়, বই, খাতা-কলম সবই পড়ে রয়েছে। নেই শুধু সামিয়া। তার এসব স্মৃতি বহন করে চলছে মা। কিন্তু থামছে না কান্না।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার ২নম্বর ওয়ার্ডের নাওগোদা গ্রামের সামিয়ার বাড়ি। বাবা নিজাম উদ্দিন প্রবাসে থাকেন। ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ মা শারমিন আক্তার মেয়ে সামিয়াকে লাকসাম ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসায় (আবাসিক) ভর্তি করেন। রমজান ও ঈদের ছুটি শেষে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হলে তাকে মাদ্রাসায় রেখে যান।
সামিয়ার মায়ের শুরু থেকেই অভিযোগ, তাঁর মেয়েকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি মিমাংসার জন্য কতিপয় রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় সামাজিক ভাবে সমঝোতার জন্য চাপ দেন।
সামিয়ার মা শারমিন বেগমের অভিযোগ, তাঁর মেয়ে সামিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর পর তিনি হত্যা মামলা দায়ের করার জন্য একাধিকবার লাকসাম থানায় গেলেও পুলিশ মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানান। পরে সামিয়ার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে সুষ্ঠ তদন্তসহ বিচারের দাবি জানিয়ে তৎকালীন লাকসাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কাউছার হামিদ বরাবর তিনি একটি আবেদন করেন। অবশেষে ঘটনার ১০দিন পর ২৭ এপ্রিল তিনি লাকসাম থানায় হত্যা মামলাটি দায়ের করেন।
তাঁর অভিযোগ, লাকসাম থানায় দায়েরকৃত হত্যা মামলায় মাদরাসার প্রধান, আবাসিক শিক্ষক এবং দারোয়ানসহ ৮ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করতে চাইলে থানা পুলিশ মামলায় কারো নাম উল্লেখ করতে দেয়নি। পুলিশ অজ্ঞাত আসামীদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা সুপার জামাল উদ্দিন, শিক্ষক শারমিন ও দারোয়ান খলিলকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ঘটনার সঠিক রহস্য উদঘাটন হবে।
নিহত সামিয়ার মা'র অভিযোগ, তাঁর মেয়ের মৃত্যুর পর পুলিশসহ অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। কেউ-ই আমার মেয়ে সামিয়ার খুনিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনছে না। ঘটনার এক বছর অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি!
ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তাঁর মেয়েকে যৌন নির্যাতনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হলেও পুলিশের নিরব ভূমিকা নিয়ে তিনি অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যাঁরা তাঁর আদূরে মেয়েকে হত্যা করেছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার প্রধান মো. জামাল উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে আণীত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ঈদের ছুটির পর সপ্তাহখানেক আগে ওই শিক্ষার্থীর নিয়মিত ক্লাস শুরু হয়। তবে সে মাদ্রাসার আবাসিকে থাকতে অনাগ্রহী ছিলো।
তিনি জানান, ঘটনারদিন (১৭ এপ্রিল) রাতে ওই শিক্ষার্থী তার মাকে ফোন দেয় এবং বাড়ি যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। পরে গভীর রাতে ওই ছাত্রী মাদরাসার পাঁচতলার একটি জানালার গ্রীলের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পালাতে গিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়। এমতবস্থায় স্থানীয় লোকজন দেখে আমাকে মুঠোফোনে অবহিত করলে আমিসহ অন্যান্যরা ঘটনাস্থল থেকে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সে মারা যায়।
এদিকে সামিয়ার মৃত্যুর পর পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে তার বাম হাতে একটি আঘাতের চিহ্ন ব্যতীত শরীরের অন্য কোথাও কোনো রকম আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে স্পষ্ট ওঠে এসেছে তার গোপনাঙ্গে এবং পায়ুপথে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই মাদরাসার আরো একাধিক শিক্ষার্থীর অনুরূপ মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।পারিবারিকভাবে আইনী প্রক্রিয়ার পদক্ষেপ না নেওয়ায় ওইগুলো তদন্তবিহীন ধামাচাপা পড়ে যায়। তবে মাদরাসার প্রধান মো. জামাল উদ্দিন বলেন, ওইসব ঘটনা ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে সামাজিক ভাবে ফয়সালা হয়েছে।
এই ব্যাপারে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাকসুদ আহাম্মদ জানান, নিহত ওই শিক্ষার্থীর মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে তার গোপনাঙ্গে এবং পায়ুপথে যৌন নির্যাতনের ঘটনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে আরো কিছু সুক্ষ্ম বিষয় ও মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত চলমান রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওসি জানান, আদালতে এখনো মামলাটির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি।
তিনি জানান, মামলার পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) অন্যত্র বদলী হওয়ায় নতুন করে মামলাটির তদন্তভার অপর কর্মকর্তার ওপর ন্যস্ত হওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত; ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটার দিকে কুমিল্লার লাকসাম পৌরসভা কার্যালয় সংলগ্ন ইক্বরা মহিলা মাদ্রাসার পাঁচতলা ভবনের পাশে পৌরসভা সড়কের ওপর থেকে ওই মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া আক্তারকে স্থানীয় লোকজন আহত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং স্থানীয় একটি হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি করেন। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে রাজধানী ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিনই (১৮ এপ্রিল, শুক্রবার) দুপুরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আরিফ খান
Developed by Shakil IT Park