
বাংলাদেশ আবারও নতুন করে বৈদেশিক ঋণ সহায়তা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কর্মসূচির আগের কিস্তি এখনও আটকে থাকায় নতুন ঋণ আলোচনা ঘিরে অর্থনৈতিক সংস্কার, শর্ত এবং সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বাংলাদেশ অনানুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার নতুন ঋণ সহায়তা চেয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওয়াশিংটনে বৈশ্বিক ঋণদাতা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকে এসব বিষয় উত্থাপন করেছেন। প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক সাড়া মিললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি এবং আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে, বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে, যা আগে ছিল ৪.৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি শুরু হওয়া এই কর্মসূচির অধীনে এখন পর্যন্ত পাঁচটি কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার। বাকি রয়েছে আরও ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার।
এই কর্মসূচির আওতায় কিস্তিগুলো সংস্কার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে ধাপে ধাপে ছাড় করা হয়। প্রথম কিস্তি দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে, এরপর ডিসেম্বর মাসে দ্বিতীয় কিস্তি এবং ২০২৪ সালের জুনে তৃতীয় কিস্তি পাওয়া যায়। তবে সংস্কার শর্ত পূরণে বিলম্ব হওয়ায় চতুর্থ কিস্তি আটকে যায় এবং পরে তা পঞ্চম কিস্তির সঙ্গে একত্রে ২০২৫ সালের জুনে ছাড় হয়।
সবশেষ ষষ্ঠ কিস্তি, যার পরিমাণ প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার, গত ডিসেম্বরেই পাওয়ার কথা থাকলেও তা এখনো ছাড় হয়নি। কর্মকর্তাদের মতে, আগামী জুনে জাতীয় বাজেট ঘোষণার পর পরবর্তী পর্যালোচনায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আসন্ন বাজেট এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি কমানো এবং ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে আইএমএফের আটকে থাকা কিস্তি পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকদের মতে, আইএমএফের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত। কারণ খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে। আইএমএফ ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, কঠোর তদারকি এবং স্বচ্ছ ঋণ শ্রেণিবিন্যাস নিশ্চিত করার মতো সংস্কার দেখতে চায়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগের সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় নতুন ঋণের ক্ষেত্রে শর্ত আরও কঠোর হতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতায় সরকার নতুন ঋণ সহায়তার দিকে ঝুঁকছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, আইএমএফের সহায়তা না পেলে রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা এবং আমদানি ব্যয় মেটানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইএমএফের ঋণ অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সহায়ক হলেও শর্তের কারণে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে। বিনিময় হার নমনীয় করা, ভর্তুকি কমানো এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করার মতো বিষয়গুলো সাধারণ জনগণের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে বলেও মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আইএমএফের সঙ্গে বসন্তকালীন বৈঠকে নতুন ঋণের পরিমাণ, শর্ত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সরকারের লক্ষ্য একদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট মোকাবিলা করা, অন্যদিকে শর্তগুলো দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্রহণযোগ্য অবস্থানে রাখা।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন মূল প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কতটা কার্যকর সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারবে এবং বাস্তব অগ্রগতি দেখাতে পারবে। এর ওপর নির্ভর করবে আইএমএফের বাকি কিস্তি ছাড় পাওয়া এবং নতুন ঋণ সহায়তার ভবিষ্যৎ।
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ আরিফ খান
Developed by Shakil IT Park