গ্রামবাংলার নদী, খাল, বিল আর পুকুরে একসময় মাছ ধরার অন্যতম জনপ্রিয় উপকরণ ছিল বসি। বাঁশ, দড়ি ও মজবুত সুতার সমন্বয়ে তৈরি এই ফাঁদে ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ ধরা পড়ত সহজেই। বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে কিংবা শীতের শুরুতে পানির ধারা পরিবর্তন হলে গ্রামের মানুষ দল বেঁধে বসি পেতেন। রাতভর অপেক্ষা শেষে সকালে বসি তুলে আনলে দেখা যেত রুই, কাতলা, শিং, মাগুরসহ নানা জাতের মাছ ঝাঁক বেঁধে ধরা পড়েছে।
বসি পেতে রাখা ছিল শুধু মাছ ধরার কৌশল নয়, এটি ছিল গ্রামীণ জীবনের আনন্দঘন একটি আচার। সন্ধ্যায় গ্রামের প্রবীণরা বসি পেতে যেতেন, সাথে থাকত কিশোর-যুবকেরা। পুকুরের পাড় বা খালের ধারে বসে গল্পগুজবের ফাঁকে ফাঁকে তারা অপেক্ষা করত মাছ ধরা পড়ার জন্য।
কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতি আর আধুনিক মাছ ধরার সরঞ্জামের সহজলভ্যতায় এই প্রথা আজ বিলুপ্তির পথে। এখন বাজারে পাওয়া যায় সূক্ষ্ম জাল, বড় ফাঁদ, এমনকি কারেন্ট দিয়ে মাছ শিকারের অবৈধ পদ্ধতিও। এসবের ফলে বসি দিয়ে মাছ শিকারের আগ্রহ কমে গেছে। অনেক এলাকায় তরুণ প্রজন্ম বসি কীভাবে তৈরি হয় বা কিভাবে ব্যবহার করতে হয়—এমনকি সেটাও জানে না।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, বসি শুধু মাছ ধরার উপকরণ নয়, এটি ছিল গ্রামের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতো না, ছোট মাছ বড় হওয়ার সুযোগ পেত, আর পানির জীববৈচিত্র্য টিকে থাকত। তারা মনে করেন, নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরতে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রদর্শনী, গ্রামীণ মেলা বা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশবান্ধব মাছ ধরার পদ্ধতি পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। নইলে শুধু বসিই নয়, হারিয়ে যাবে গ্রামীণ জীবনের অনেক আনন্দ ও ঐতিহ্য।