শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারে না। আর ভ্রমণের মাধ্যমে যে শিক্ষা লাভ করা যায় তা পাঠ্যবই পড়ে লাভ করা যায় না। ভ্রমণ নিয়ে লরেন্স ডুরেল বলেন, ‘ভ্রমণ নিজেকে জানার অন্যতম উপায়।’ ফলে ভ্রমণে গিয়ে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়। এতে নিত্যনতুন অভিজ্ঞতা লাভ হয়। এছাড়া প্রত্যেক দেশে ভ্রমণকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠে। প্রতি বছরের মত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ ট্যুরের আয়োজন করে। এখানে দর্শনীয় স্থানের তালিকায় ছিল ৪টি স্থান যথাক্রমে মালনীছড়া চা বাগান, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর ও হজরত শাহজালাল (র) এর মাজার। এতে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। আর শিক্ষার্থীদের মাঝে আবেগঘন মুহূর্ত বিরাজ করে। সবাই অধীর আগ্রহে ২৯ জুলাইয়ের জন্য অপেক্ষায় ছিল। তিনটি দর্শনীয় স্থানের ট্যুর হলেও ১ দিনেই ছিল শুরু আর সমাপ্তি। এবারের ট্যুরের থিম ছিল, Travel to learn, United to thrive.
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে অবশেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ আসে। আস্তে আস্তে শিক্ষার্থীদের উপস্তিতি ক্যাম্পাসে বাড়তে থাকে। ৫টি বাসে করে গন্তব্যে রওয়ানা দিবে। আগন্তুক শিক্ষার্থীদের মুখে আনন্দের অনুভূতি। সবাই তাদের বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছিল। নির্ধারিত সময় থেকে একটু বিলম্বে বাস যাত্রা করে। রাতের ক্যাম্পাসে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা সবার জন্য শুভকামনা জানায়। প্রতি বাসে শিক্ষার্থীরা নেচে গেয়ে আনন্দ করে। ১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী আরিফ আহমেদ তার সুরেলা কন্ঠে গান শুনিয়ে মুগ্ধ করে। তার সাথে সুর মিলিয়ে অন্যরা গান গাইতে থাকে। এরপর তারা ইংরেজিতে দীর্ঘ সময় কথা বলে রম্য বিতর্ক করতে থাকেন। মজার মজার কথা শুনে সবাই হেসে দেয়। গভীর রাত হয়ে যায়। কিন্তু কেউ ঘুম পড়ে না। অতঃপর হবিগঞ্জে যাত্রাবিরতি দেয়। দীর্ঘ সময় বাস জার্নি করে বাইরে আসে অনেকে। ভোর রাত তখন ৪টা বাজে। এত রাতে খোলা আকাশের নিচে সত্যি অনেক ভাল লাগছিল। বিশেষ করে আকাশের এক কোণে রক্তিম আভা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছিল। যাত্রাবিরতি সময়ে কেউ কেউ ফজরের নামাজ আদায় করে। উল্লেখ্য পাশে ছোট একটা নামাজের স্থান আছে।
বিরতি শেষ করে বাস চলতে থাকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। সকাল ৭টায় হোটেল আল সাবাতে পৌঁছায়। সেখানে শিক্ষার্থী শিক্ষক ফ্রেশ হয়। ফলে অনেক ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। তারপর পানসী রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তা মুরগী খিচুড়ি খাওয়া হয়। খিচুড়ির স্বাদ ছিল খুবই লোভনীয়। নাস্তা শেষ করে আশেপাশে ঘুরতে থাকে কেউ। তবে নজরে পড়বে সিলেট কম ঘনবস্তি পূর্ণ এলাকা। সিলেট শহরে পদার্পণ করে অনেক ভাল লাগছিল। সিলেট শহর বাংলাদেশের লন্ডন নামে পরিচিত। কারণ এখানের অধিকাংশ মানুষ লন্ডন প্রবাসী। আমরা আর বিলম্ব না করে রওয়ানা দেই আমাদের প্রথম গন্তব্য মালনীছড়া চা বাগান। বাসের জানালা দিয়ে চা বাগান দেখতেই মন শিহরিত হয়ে যায়। কত শত কল্পনায় কিংবা ভিডিওতে অনেক দেখছি। বাস্তবে এটাই প্রথম চা বাগান আর পাহাড় দেখা।উপমহাদেশের প্রাচীনতম চা বাগান: ১৮৪৯ সালে লর্ড হার্ডসনের উদ্যোগে ১,৫০০ একর জমিতে স্থাপিত। এটি শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রথম চা বাগান নয়, বরং পুরো উপমহাদেশের প্রথম ও বৃহত্তম চা বাগান।
বাগানজুড়ে অসংখ্য সারিবদ্ধ চা গাছ ছোট ছোট টিলা ও সমতল ভূমির উপর ছড়িয়ে আছে। যতদূর চোখ যায়, শুধু সবুজ আর সবুজ। পাহাড়ি ঢালে সাজানো চা গাছগুলো এক অপূর্ব নান্দনিকতা সৃষ্টি করে। চা বাগান দেখতে অনেকটা ত্রিভুজের মত ভূমি থেকে উঁচু হয়ে আছে। অনেক কষ্টে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে শীর্ষে উঠি। পাহাড়ের উপর থেকে নিচে দেখতে ভয়ানক লাগলেও সুন্দর দৃশ্য ছিল। দূরের দৃশ্য উপর খুব মনোরম দেখায়। হঠাৎ করে চা শ্রমিকের কথা ভাবতে থাকি। দুর্গম পাহাড়ে এত পরিশ্রম সারাদিন করেও ন্যায্য মজুরি পায় না। কিন্তু চায়ের মূল্য কম নয়। সর্বোপরি, বাগানের চারদিকে ছায়াময় গাছ আর ঠান্ডা বাতাস মনের সব ক্লান্তি দূর করে। এখানকার বাতাস ধূলিমুক্ত ও নির্মল, যা শহরের কোলাহল থেকে ভিন্ন এক প্রশান্তির অনুভূতি দেয়।
আমাদের পরবর্তী গন্তব্য রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট। এই বর্ষা মৌসুমে রাতারগুল ভ্রমণের উপযুক্ত সময়। এখানে এমন অদ্ভুত বৃক্ষ আছে যা অনেক পানিতেও বেঁচে থাকে। বর্ষায় পানি বৃদ্ধি পেলে দর্শনার্থীরা নৌকা চড়তে ভীড় করে। আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে গহীন বনে চলে নৌকা। আমাদের জন্য পর্যাপ্ত নৌকা ছিল এখানে। প্রত্যেক নৌকায় ৬ জন করে বসতে পারে। এ সময় মাঝির সাথে গান গল্পে মেতে উঠি। তিনি ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া গান শোনায়। তাদের জীবিকা সম্পর্কে জানতে পারি। তারা প্রতিদিন নৌকা চালিয়ে ৬০০ টাকা করে পায়। আর এই টাকা দিয়ে থাকে ঘাট কর্তৃপক্ষ। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অনেক ভীড় থাকলেও তিনি নির্ধারিত টাকাই পেয়ে থাকে। এখানে ছবি তুলতে গিয়ে অনেক দর্শনার্থী ফোন পানিতে হারিয়ে ফেলে। সুতরাং সাবধানে ফোন রাখতে হবে। রাতারগুলে আছে নানা প্রজাতির গাছপালা, পাখি, সাপ, বানর ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির কলকাকলি বনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। এছাড়া সোয়াম ফরেস্ট এর পানিতে অনেক বিচ্চু, পোকামাকড় থাকে। তাই পানিতে না নামাই ভাল।নির্জন এলাকায় যত গভীরে যাই ততই ভাল লাগে। চর্তুদিকে শুধু সবুজের সমারোহ আর পানি। শহরের কোলাহল ছেড়ে নির্মল বাতাস, নিস্তব্ধ পরিবেশ মুগ্ধ করে। এখানে সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর হচ্ছে পানির উপর দাঁড়িয়ে থাকা গাছপালা, স্বচ্ছ পানিতে গাছের প্রতিবিম্ব, নৌকাভ্রমণে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাত্রা, সূর্য, মেঘ ও ছায়ার খেলা। তবে বনের ভেতরে গেলে কিছুটা সুন্দরবনের মত লাগে
দুপুরে লাঞ্চের সময় হয়ে গেলে সোয়াম ফরেস্ট থেকে বিদায় নিই। পরবর্তীতে চলে যাই ভোলাগঞ্জ। এখানে আসতেই চোখ জুড়িয়ে যায় মেঘালয়ের পাহাড় দেখে। পাহাড় যেন আকাশচুম্বী। পাহাড়ের সাথে মিশে গেছে সাদা মেঘের ভেলা। দূর থেকে দেখা যায় পাহাড়ি জনপদের ঘরবাড়ি, সে বিশাল উঁচু জায়গায়। সেখানে আশেপাশের রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খাই। কিন্তু আমাদের সাথে অনেক মানুষ থাকায় অনেক ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আর তীব্র গরমে অনেকে বিষন্ন হয়ে গিয়েছিল। এত সমস্যার মাঝে প্রশান্তির বিষয় ভোলাগঞ্জ সাদা পাথর দেখতে যাওয়ার অনুভূতি। বিকেলে সবাই নির্ধারিত নৌকাতে করে সাদা পাথর পর্যন্ত যাই। প্রতি বাসে ৯ জন করে ছিল। নৌকাতে উঠতে উত্তাল ঢেউ আর ঢেউ। এতে নদী ভাঙনও হয়েছে। তবে নদীর পাড়ে কিছু গরু ও মহিষ দেখা যায় আপন মনে ঘাস খাচ্ছে। কিছু নৌকায় বালু আর পাথর নিয়ে যাচ্ছে। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত সাদা পাথর পৌঁছে যাই। সাদা পাথর দেখে রীতিমতো বিমোহিত হয়ে যায় অনেক দর্শনার্থী। সাদা পাথরের মূল আকর্ষণ এর স্বচ্ছ নদীর পানি। পাহাড়ি ঝরনা থেকে আসা শীতল জলধারা এখানে এসে পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। সূর্যের আলো পড়লে পানিতে রূপালি ঝিলিক খেলে। পাথরের বুক চিড়ে ঝর্ণার পানি প্রবহমান। আর এই পানি অনেক ঠান্ডা। ফলে তীব্র গরমে আরামদায়ক ছিল। এতে আমরা স্নান করে নিই।
এখানে দর্শনার্থীদের জিনিসপত্র, ব্যাগ লকারে রাখা যায়। আকাশে সাদা মেঘ আর জমিনে স্বচ্ছ পানিতে মেঘের প্রতিচ্ছবি এক অপুর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য। হঠাৎ করে গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হয়। আবার হঠাৎ করে সূর্যাস্তের দৃশ্য ভ্রমণ পিপাসু মন রাঙিয়ে দেয়। পাহাড়ের কোলে সূর্যের আলো ভেঙে বাহারি রঙের খেলা তৈরি করে। কিছু দর্শনার্থী আবার ২/১টা সাদা পাথর নিয়ে আসে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র পাথর চুরি করে বাণিজ্য করে। এক দর্শনার্থী বলেন, আমি ৬ মাস আগে এসেছিলাম, তখন অনেক পাথর ছিল। সাদা পাথরের জন্য মূলত মানুষ ভীড় জমায়। কিন্তু এভাবে পাথর কমতে থাকলে দর্শনার্থীরা আগ্রহ হারাবে। বিলুপ্তির পথে যাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের বিমুগ্ধ করে উঁচু উঁচু পাহাড় দেখে। এত উঁচু পাহাড় দেখে মনে দেখে মনে হয় আকাশ আর জমিন একসাথে মিশে গেছে। সন্ধ্যা হলে পাহাড়ি জনপদে বিদ্যুতের আলো অতি চমৎকার দেখায়। এই আলো দূর থেকে মনে হয় আকাশের তারকা পাহাড়ে নেমে এসেছে। পাহাড়ে এত সবুজ বৃক্ষ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সন্ধ্যার পূর্বে মাইকিং করে দর্শনার্থীদের ফিরে ফিরতে আহ্বান করা হয়। এখানে নির্ধারিত সময়ের বেশি কেউ থাকতে পারবে না। অতঃপর আমরা সবাই নদীঘাটে ফিরে আসি। সেখান কিছু কেনাকাটা করি। পরে হজরত শাহজালাল (র) এর মাজার ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই।
সাধারণত সন্ধ্যার পরেই মাজারে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। তৎকালীন বাংলার সিলেট অঞ্চলে হিন্দু রাজা গৌর গোবিন্দ-এর অত্যাচারে মুসলমানরা অত্যন্ত কষ্টে ছিল। এই অবস্থায় সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহের ডাকে সাড়া দিয়ে হযরত শাহজালাল (রহঃ) ৩৬০ আউলিয়ার একটি দল নিয়ে সিলেটে আসেন। তিনি মুসলিম সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে সিলেট যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আল্লাহর রহমতে বিজয় অর্জিত হয়, এবং মুসলমানদের ধর্মচর্চার স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
বিজয়ের পর হযরত শাহজালাল (র) সিলেট অঞ্চলে থেকে যান এবং ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি মানুষের মধ্যে সততা, নম্রতা ও দানশীলতার শিক্ষা দেন। কোনো জোরজবরদস্তি না করে, শান্তিপূর্ণ ও আধ্যাত্মিক পদ্ধতিতে ইসলাম প্রচার করেন। ৩৬০ জন আউলিয়া তাঁর সঙ্গী ছিলেন, যারা বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে গিয়ে ইসলাম প্রচার করেন। তিনি স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে মানবিক সম্পর্ক স্থাপন করে ধর্মের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেন। এখানে প্রতিদিন মানুষ আসে মাজার দেখা ও জিজারত করতে। তবে মাজারে সিদজাহ দেওয়া নিষিদ্ধ। এখানে আরো অনেক বিখ্যাত মানুষের মাজার আছে।
অবশেষে মাজার থেকে রাতের ডিনারের জন্য আবারও পানসী রেস্তোরাঁয় চলে আসি। রাতের খাওয়া শেষ করে পুরান ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিই। আবারও বাসে গানের সুরে মাতিয়ে রাখে। ভোর ৬টায় আমরা ঢাকায় পৌঁছে যাই। সর্বোপরি, সিলেট ভ্রমণ ছিল এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি। বিশেষ করে ১৫ ব্যাচ সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ স্মৃতি। এক সময় বন্ধু বান্ধব এর সাথে দেখা না হলেও বন্ধুত্ব রয়ে যাবে স্মৃতির পাতায়।