ছাত্রদের গণতন্ত্র চর্চার জন্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন অন্যতম মাধ্যম। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন জরুরী। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনা ও স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার হল এই ছাত্র সংসদ।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্র সংসদ নেতারা অতীতের বিভিন্ন সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যদি দেশে অহিংস, শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক, নিয়মিত ছাত্র রাজনীতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গণতান্ত্রিক নির্বাচন হতো তাহলে আজ বাংলাদেশ এই সহিংস, চাঁদাবাজি ও গুন্ডামির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতো এবং আইনের প্রতি নিষ্ঠাবান শত শত রাজনৈতিক নেতা উপহার দিতো এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসে গৌরবময় ভূমিকা রাখে এই ছাত্র সংসদ। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে পরবর্তীতে ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান, ৭১-এর স্বাধীন বাংলাদেশ নির্মাণের লক্ষ্যে রক্তক্ষয়ী জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম এবং পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে স্বৈরাচার ও সামরিকতন্ত্রের বিপরীতে দাঁড়িয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে সাহায্য করেছে ঢাবি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ। ডাকসুর নেতৃবৃন্দের সাহসী ও বলিষ্ঠ উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়৷ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর সহসভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান।
বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসে ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেয়। নির্বাচিত সরকার ছাত্রসংসদের মাধ্যমে উঠে আসা ছাত্রপ্রতিনিধিকে তাদের জন্যে হুমকিস্বরূপ বিবেচনা করতে দেখা যায়৷ তাই নানা তালবাহানা করে তারা ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ করে রাখে।
২০১২ সালের ১১ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থী ডাকসু নির্বাচনের দাবিতে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করেন। দাখিলকৃত রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের ১৭ই জানুয়ারি বাংলাদেশের উচ্চ আদালত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকসু নির্বাচনের নির্দেশ দেয়। উচ্চ আদালতের আদেশের সাত মাস পেরিয়ে গেলেও নির্বাচনের কোনো আয়োজন দৃশ্যমান না হওয়ায় ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উকিল নোটিস পাঠান রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। জবাব না পেয়ে ১২ সেপ্টেম্বর উপাচার্যসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনেন তিনি। উচ্চ আদালতের আদেশের প্রেক্ষিতে ২০১৮ – র ১৬ই সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা দেয় যে ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে ডাকসুর নির্বাচন।
২০২৪ এর জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বৃহৎ সংস্কারের উদ্দেশ্যে ছাত্রদের অনুরোধে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মো: ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দ্বায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময় যেসকল দাবি উঠে তার ভিতর দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হওয়া দাবি অন্যতম। দেশের প্রধান চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ থাকলেও গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের নিজস্ব আইনে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিধান নেই। যেমন, ২০০৯ সালের ৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে পাশ হওয়া বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদের কোনো বিধান রাখা হয়নি।
যার কারণে নির্বাচন করতে হলে প্রথমে ছাত্র সংসদ আইনের খসড়া অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে পাশ করে তা অনুমোদনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাতে হবে। বিধানটি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে সংযুক্ত হলে তারপরেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজন যাবে।
এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্র সংসদ না থাকলেও প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে দিতে হয় ছাত্র সংসদ ফি। গত ১৬ বছরে এ খাতে শিক্ষার্থীদের থেকে অন্তত ৫৬ লাখ টাকা ফি নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। যদিও ফি জমাদানের রসিদ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথাও ছাত্র সংসদের অস্তিত্ব নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা জানেন না তাদের দেওয়া এই টাকা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে পারছে না কর্তৃপক্ষও। [জাগো নিউজ, ১৩ মে, ২০২৫]
পরিশেষে বলা যায়, ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচন নিয়মিত হলে শিক্ষার্থীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চর্চায় গুণগত পরিবর্তন আসবে। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দাবি ও অধিকারের কথা তুলতে পারবে। এবং শিক্ষার্থীরা নিয়মিত গণতান্ত্রিক চর্চার অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। তাই সকল কিছুর পূর্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন চাই।